মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কলারোয়া উপজেলা ।

অগ্নিগর্ভ ১৯৭১। বাঙালী জাতি এক সূত্রে গাঁথা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর উদাত্ত আহ্বানে জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনে বাংলার দামাল ছেলেরা রণক্ষেত্রে। ৮ নং সেক্টরের অংশ হিসেবে উপজেলা কলারোয়ার মুক্তিপাগল জনতা সেদিন পিছিয়ে ছিলনা জীবন দেয়া-নেয়ার এই মহোৎসবে। প্রতিবেশী রাস্ট্র ভারত গমনকারী গৃহহারা, স্বজনহারা, মানুষের ঢল ছিল উপজেলার সীমান্ত অভিমুখে। এছাড়া আরও এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবীদার তারুণ্যের ইস্পাত কঠিন প্রতিজ্ঞায় সীমান্ত অভিমুখে যাত্রা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
বাঙালী জাতিস্বত্ত্বার হাজার বছরের স্বপ্ন সফল করতে এরাই আমাদের অহংকার জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিসেনার দল। ১৯৭১ সালের ১৭ মে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কলারোয়ার ইতিহাসে একটি গা শিউরে উঠা দিন। একজন অধ্যাপকের নের্তৃত্বে ৭ জন ছাত্র ও একজন সাধারণ কৃষক, যারা সবাই ছিল ফরিদপুর এলাকার। খুলনা-চুকনগর-মনিরামপুর-কেশবপুর হয়ে পায়ে হেঁটে শ্রান্তি লাঘবের উদ্দেশ্যে যাত্রা বিরতি করে কলারোয়া উপজেলার বামনখালি বাজারে। তাদের মধ্যে তখন একাধারে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আতংক, অপরদিকে কাংখিত সীমান্ত অতিক্রমের আশার দোলাচলে আশান্বিত মন। নিষ্ঠুর নিয়তি হয়তো সেদিন মুচকি হেসেছিল। বামনখালি বাজারে তখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল ডাক্তার মোকছেদ আলী নামক এক ' শান্তি কমিটির সদস্য'। সে এদেরকে ধরে ফেলে এবং মুক্তিফৌজ হিসেবে চিহিৃত করে। তখন এদের মধ্য থেকে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় ৩ জন ছাত্র। যারা তৎকালীন সময়ে দৌলতপুর বিএল কলেজের ছাত্র ছিল। তখন নরঘাতক ডাঃ মোকছেদ এর মরণথাবা এড়াতে সক্ষম হয়নি হতভাগ্য অধ্যাপকসহ ৪ ছাত্র ও ১ জন কৃষক।
পাকিপ্রেমী মোকছেদ এদেরকে কলারোয়া থানার তৎকালীন মেজ দারোগা আব্দুস সালামের হাতে তুলে দেয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মেজ দারোগা জানতে পারে এই দলের মধ্যে তার এক দুঃসম্পর্কীয় ভাইপো রয়েছে। পাকহানাদারদের পদলেহনকারী, অভিনয়পটু এই দারোগা তখন তাদেরকে অভয় দান করে থানা অভ্যন্তরে তার বাসায় নিয়ে যায়। এর পরবর্তী ইতিহাস অতীব করুণ, রক্তে ভেজা, হৃদয়বিদারক। করিৎকর্মা মেজ দারোগা কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার ওয়ারলেসে যোগাযোগ করে হানাদার পাক বাহিনীর এক পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের সাথে। বেলা ১০টার দিকে গণহত্যকারী হানাদার বাহিনীর একটি কনভয় থানা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ ও মেজ দারোগা সালামের সাথে অসংখ্য বাঙালীর রক্তস্নাত এই পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের কয়েক মিনিটের কথোপকথনের মধ্যে নির্ধারিত হয়ে যায় হতভাগ্য ৫ জনের বিধিলিপি (কৃষককে রেখে দেয় থানা হাজতে)।
এসময় থানায় উপস্থিত ২ জন অবাঙালী কনস্টেবল ওসিম খান, শের খান এবং উপজেলা রাজাকার কমান্ডার নুরুল হককে ক্যাপ্টেন নির্দেশ দেয় ধৃতদের চোখ বেঁধে থানার উত্তর পাশে ফাঁকা যায়গায় নিয়ে যেতে (বর্তমান গণকবরের কয়েক গজ দক্ষিণে)। এদের সাথে কয়েকজন সশস্ত্র পাক সেনা যায়, যাতে সহজে হাত পিছমোড়া ও চোখ বাঁধা যায়। বেলা তখন ১১ টা। হতভাগ্যদের দাঁড় করিয়ে দেয়া হল পাশাপাশি। ইতোমধ্যে উদ্যত রাইফেলের মুখে কলারোয়া বাজার হতে কয়েকজন দিন মজুরকে ধরে এনে একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। সেদিনের সেই দিন মজুরদের মধ্যে অমেদ আলী, গোলাপ সরদার কালের সাক্ষী হয়ে শীর্ণ, মানবেতর জীবন-যাপন শেষে মাত্র কয়েক মাস আগে মারা গেছে। বন্দী, নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রীরা তখন রীতিমত কাঁপছিল উদ্যত রাইফেলের মুখে দাঁড়িয়ে। এসময় বধ্যভূমির পূর্ব দিকে তৎকালীন হক লাইব্রেরীর পিছনের দরজায় এবং পশ্চিমে বসবাসকারী বাসিন্দারা প্রত্যক্ষ করল এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ক্যাপ্টেনসহ এগিয়ে এলো ইতোপূর্বে উল্ল্লেখিত ২ অবাঙালী পুলিশ কনস্টেবল, রাজাকার কমান্ডার নুরুল হক (বর্তমানে মৃত), ওমর আলি, আবু তালেবসহ অপর ৩ পাঞ্জাবী নরপশু। তাদের সাথে আরও কয়েকজন রাজাকার ও পাকিপ্রেমী যায় বধ্য ভূমিস্থলে। হঠাৎ অমোঘ নিয়তির বাণী নিঃসৃত হলো ক্যাপ্টেনের মুখ দিয়ে "তোম লোগ তৈয়ার হো যাও, পাকিস্তানকা দুশমনপর গোলি মার দো"। মুহুর্তের মধ্যে প্রায় একইসাথে গর্জে উঠল ৬ টি রাইফেল। ছুটে গেল মৃত্যুবাণ তপ্তশীসা। গর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়ল আবাল্য বাংলা মায়ের ধূলিমাখা সন্তান ৫ জন বাঙালীর দেহ। নিথর-নিস্পন্দ, কিন্তু না, মৃত্যুশেল হৃদয় ছুঁয়ে গেলেও এক হতভাগ্য তরুণ তখনও জীবিত। তার..."একট পানি, একটু পানি" আহাজারিতে থানার পশ্চিমপাশের বাসিন্দা আজিজ খানের (বর্তমানে মৃত) স্ত্রীর মাতৃত্ববোধ সকল আতংককে উপেক্ষা করেছিল।
মহীয়সী এই মহিলা মৃত্যুপথযাত্রী ওই তরুণের মুখে তুলে ধরেছিলেন পানির পাত্র। তাৎক্ষনিকভাবে অবশ্য এই মহীয়সী জননীকে সেখান থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল নরপশুর দল। দিনমজুরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাটি চাপা দেয়ার সময় ওই হতভাগ্য তরুণ তখনও বেঁচে ছিল। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। কলারোয়া পাকি হানাদার মুক্ত হলো। বিজয়ীর বেশে ফিরে এলো দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনকারী মুক্তিসেনার দল। তারপর পেরিয়ে গিয়েছে অনেকগুলো বছর, বেত্রবতী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। ১৯৮৫ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার ও কলারোয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের নের্তৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার আতিয়ার রহমান (প্রয়াত) পারিখুপী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা গর্ত খুঁড়ে গণকবরটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করেন। অবশ্য তখন হতভাগ্যদের দেহাবশেষ এভাবে তোলাতে সমাজের অনেকে ভ্রুকূটি করেছিল, ধর্মীয় অণুশাসনেরও অজুহাত দেখিয়েছিল।
এরপরের ইতিহাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে পাকা করা এ গণকবরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপজেলা ম্যজিষ্ট্রেট গোলাম মহিউদ্দীন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কলারোয়া ফুটবল ময়দানের পাশে ৫ মুক্তিকামী মানুষকে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় ১৯১০ সালের ১ মার্চ কলারোয়া থানায় ১০ জনের নামে একটি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এ মামলা রেকর্ডের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর কলারোয়া গণকবরে শায়িত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় মিললো। এ'সকল শহীদরা হলেন সাহেব আলী, মুন্সী মহাসীন, সুভাষ চন্দ্র, শিশির চন্দ্র ও মনোরঞ্জন। এঁরা সকলেই গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা গ্রামের অধিবাসী।
১৯১০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলার ফুকরা গ্রামের মৃত মুন্সি রাহেন উদ্দিনের ছেলে ফায়েকুজ্জামান বাদি হয়ে সাতক্ষীরা জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে এ বিষয়ে মামলা দায়ের করেন। আদালতের বিচারক এসএম মাসুদুজ্জামান আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। তৎকালীন ওসি ইনামুল হক অভিযোগের বিষয়ে থানা উপ-পরিদর্শক মনিরুল কবিরের উপর তদন্তভার দেন।
থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল কবির তদন্ত শেষে অভিযুক্ত ১০ যুদ্ধাপরাধীদের নামে থানায় মামলা(নং-২,তাং-০১/০৩/১০,ইং) রেকর্ড করেন। মামলাটি দ.বিধির ৩০২/৩৪/১১৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়। আসামিরা হলো: কলারোয়া উপজেলার উত্তর রায়টা গ্রামের মাওলানা ওমর আলী(৫৬),দামোদরকাটি গ্রামের আবু তালেব(৫৭), ব্রজবকসা গ্রামের রাজাউল্লাহ(৬২),মোহর আলী(৬৪) ও জমির আলী(৬২), জালালাবাদ গ্রামের ইয়াকুব আলী(৭০), হামিদপুর গ্রামের মাওলানা শামসুজ্জামান হামিদি(৫৯), খলসী গ্রামের আব্দুর রহিম(৬৫), দরবাসা গ্রামের নূর ইসলাম(৬২) ও একই গ্রামের আবু বক্কর পঁচা(৬১)। বাদি তার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ১৭ মে গোপালগঞ্জ জেলার সাহেব আলী, মুন্সি মোঃ মহসিন, সুভাষ চন্দ্র, শিশির চন্দ্র ও মনোরঞ্জন চন্দ্র ২০ সদস্যের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে ট্রেনিং এর জন্য ভারতে যাওয়ার পথে কলারোয়া স্কুল ফুটবল মাঠের পাশে একটি দোকানে খাবার কিনতে যান। এসময় মামলার আসামিরা গোপালগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা জানতে তাদের ৫ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরে তাদেরকে কলারোয়া থানার পিছনে ফুটবল মাঠের দক্ষিণ পাশে হাজী আব্দুল মালেকের জমিতে নিয়ে গিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানো হয়। এসময় আসামি ওমর আলী বাদির সহোদর ভাই সাহেব আলীকে গুলি করে হত্যা করে। বাকী ৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে আবু তালেবের নির্দেশে অন্য সকল আসামীর সহায়তায় রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে জখম করার পর ও গুলি করে। এর মাঝে এক হতভাগ্য তরুণকে জীবন্ত অবস্থায় কবর দেয়া হয়।
তারপর থেকে আজ অবধি কলারোয়া মুক্ত দিবস ও বিজয় দিবস এলে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় এই হতভাগ্যদের সমাধিস্থল। এরপর ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস......তারপর গণকবরটি পড়ে থাকে নিতান্ত অযত্ন আর অবহেলায়।